if (:empty($schema)) { echo $schema:}বিশেষ নিবন্ধ : ইকুমেন - বসবাসযোগ্য পৃথিবী || লেখক- প্রতীক চ্যাটার্জী

বিশেষ নিবন্ধ : ইকুমেন – বসবাসযোগ্য পৃথিবী || লেখক- প্রতীক চ্যাটার্জী

এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  

ইকুমেন

→ ভূমিকাঃ-

রোমান যুগে ‘ইকুমেন‘ শব্দটি সভ্যতার উল্লেখ করার জন্য ব্যবহার করা হত। ইকুমেন শব্দটি দ্বারা মানুষ কোথায় থাকে এবং কেন সেখানে বসবাস করে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রাচীনকালে ইকুমেনগুলির অস্তিত্ব বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকমের খননকৃত জীবাশ্ম এবং অন্যান্য নিদর্শনসমূহের মাধ্যমে জানা যায়। আধুনিক যুগে ‘ইকুমেন’ বলতে যেকোনো বসবাসযোগ্য জমিকেই বোঝায়। ভূগোলবিদগণ এই শব্দটি ব্যবহার করে মানুষের দ্বারা অধিকৃত স্থায়ীভাবে বসবাসযোগ্য জমি থেকে অস্থায়ীভাবে বসবাসযোগ্য জমিকে পৃথক করে। একটি জনবসতিপূর্ণ জমির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হল –– স্থায়ী ঘর, কৃষিকাজ, শিল্পকর্ম এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ। ‘ইকুমেন’কে কোনো স্থানের কেন্দ্রীয়ক কেন্দ্র (Nuclear Centre) হিসেবে দেখা হয় যেখানে সর্বাধিক মনুষ্য কার্যকলাপ সংগঠিত হয় এবং একটি ঘনজনবসতিপূর্ণ এলাকা।

→ সংজ্ঞাঃ-

ইংরেজি “Ecumene” শব্দটি গ্রিক শব্দ “Oikoumene” থেকে উৎপত্তি, যার অর্থ বসবাসযোগ্য পৃথিবী (inhabited parts of the world)। আধুনিককালে, মার্ক জেফারসন (Mark Jefferson) ১৯২৮ সালে সর্বপ্রথম রেলপথ থেকে ১৬.০৯ কিমি-এর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগ বোঝানোর জন্য এই শব্দটি প্রয়োগ করেন।

মার্ক জেফারসনের মতে, “The portion of the state that supports the densest and most extended population and has the closest mesh of transportation lines”। অর্থাৎ তাঁর মতে, ‘ইকুমেন’ হল ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যেখানে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে।

এরপর ১৯৩৯ সালে হুইটিলসে (Whittlesey) এবং তারপরে জেমস্ (James) রাজনৈতিক ভূগোলে ‘ইকুমেন’ কথাটি ব্যবহার করেছেন। হুইটিলসে বলেন — ‘ইকুমেন’ এমন এক এলাকা যা পরিবহন জালিকার মাধ্যমে অন্যান্য সব এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবে তা কেবলমাত্র রেলপথ দিয়ে নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের পরিবহন পথগুলি বা মাধ্যমগুলি বিবেচনায় আনতে হবে। জাইদি অবশ্য ‘ইকুমেন’ কথাটি “কার্যকরী রাষ্ট্রীয় এলাকা” বা “Effective State Area” অর্থে ব্যবহার করেছেন। যে এলাকা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ইকুমেন

মধ্যযুগের শেষ পর্যন্ত বিশ্ব মানচিত্র ব্যাখ্যা করার জন্য কার্টোগ্রাফিতে ‘ইকুমেন’ ব্যবহৃত হত। প্রধান কেন্দ্রস্থলকে চিহ্নিত করা অর্থাৎ জনবহুল অঞ্চল, নির্মাণ কেন্দ্র এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপযুক্ত অঞ্চলগুলিকে ব্যাখ্যা করতে গ্রিক কার্টোগ্রাফাররা খ্রিস্টপূর্ব ১৫০ অব্দের দিকে পৃথিবীর একটি ‘ইকুমেন’ তৈরি করেছিলেন। ‘ইকুমেন’ ধারণাটি বিন্দু মানচিত্রের (Dot Map) দ্বারাও ব্যাখ্যা করা যায়। মানচিত্রে বিন্দুর অবস্থান অর্থাৎ ঘনত্ব দেখে ‘ইকুমেন’ অঞ্চলকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। বর্তমানে ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থার (GIS) দ্বারা সহজেই তা চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

[প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা ২০২০-র সমস্ত প্রবন্ধ পড়ুন এক ক্লিকে]

→ ‘ইকুমেন’ বৈশিষ্ট্যঃ-

‘ইকুমেন’ এলাকার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:-
(ক) ইকুমেন অঞ্চল রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির প্রভূত কেন্দ্রস্থল এবং রাষ্ট্রের শক্তি সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। যার প্রভাব সমগ্র এলাকার ওপর দেখতে পাওয়া যায়।
(খ) ইকুমেন উর্বর কৃষি অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল, খনি অঞ্চল হতে পারে। যেখানে প্রায় প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের সাথে সংযুক্ত থাকবে বা প্রয়োজনে আসবে।
(গ) পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি বা বিকাশের দ্বারা ইকুমেনের সম্প্রসারণ ঘটবে। সড়কপথ ও রেলপথ নতুন এলাকাতে স্থাপিত হলে ইকুমেন এলাকা সম্প্রসারিত হবে।
(ঘ) ইকুমেন অঞ্চল ভূ-রাজনীতির (Geo-politics) ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করবে।
(ঙ) কোনো কোনো রাষ্ট্রে ইকুমেনের নিজস্ব সীমানার মধ্যে কেন্দ্রীয় অঞ্চল (Core Area) অন্তর্ভুক্ত থাকে, অন্যত্র দুটি স্বতন্ত্র এলাকা। উদাহরণস্বরূপ — ভূতপূর্ব যুগোশ্লাভিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চল ছিল ডেনারিক আল্পসের পার্বত্য উপত্যকাগুলো কিন্তু ইকুমেন ডানিউবের উপনদী সংলগ্ন সমভূমি সাভা ও ড্রাভা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।
(চ) রাষ্ট্রের রাজনৈতিক শক্তির আভাসস্থল বা প্রতিরূপ হল ইকুমেন। ছোটো ইকুমেন বিশিষ্ট দেশগুলো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল।

→ ‘ইকুমেন’ শ্রেণীবিভাগঃ-

অবস্থানের বিচারে ‘ইকুমেন’কে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা — (১) কেন্দ্রীয় ইকুমেন, (২) প্রান্তীয় ইকুমেন এবং (৩) বিক্ষিপ্ত ইকুমেন।

(১) কেন্দ্রীয় ইকুমেন (Central Ecumene):- কোনো রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় স্থানে এই ধরনের ইকুমেন এলাকা গড়ে ওঠে। যেমন — ফ্রান্স।

(২) প্রান্তীয় ইকুমেন (Peripheral Ecumene):- অনেক রাষ্ট্রের ইকুমেন এলাকা প্রান্তীয় স্থানে গড়ে ওঠে। যেমন — অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাংশ, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাংশ, ব্রাজিল।

(৩) বিক্ষিপ্ত ইকুমেন (Scattered Ecumene):- এই ধরনের ইকুমেন রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে। যেমন — ভারত হলো বিক্ষিপ্ত ইকুমেনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভারতের ইকুমেন অঞ্চল মুম্বাই, দিল্লি, কলকাতা, চেন্নাই — চারটি মহানগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে ভারতের বৃহত্তম ইকুমেন উর্বর গঙ্গা উপত্যকা বরাবর সম্প্রসারিত হয়েছে, যা দিল্লি থেকে কলকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত। এছাড়া কানাডাতেও বিক্ষিপ্ত ইকুমেন দেখতে পাওয়া যায়।

ইকুমেনের বৈশিষ্ট্য অনুসারে ইকুমেন বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকেঃ-

(১) জনসংখ্যা ইকুমেন (Population Ecumene):- জনসংখ্যা ইকুমেন একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা এবং তার ঘনত্ব সম্পর্কে জানতে ব্যবহার করা হয়। সরকার এবং জমির অংশীদারদের জমি সংক্রান্ত গুরুত্ব জনসংখ্যা ইকুমেন দ্বারা প্রভাবিত হয়।

(২) কৃষি ইকুমেন (Agriculture Ecumene):- কৃষি ইকুমেন বলতে ভৌগোলিকভাবে জনবসতি যুক্ত আবাদযোগ্য জমিকে এবং কৃষিজ ক্রিয়াকলাপকে বোঝায়। এর দ্বারা জমির অর্থনৈতিক মূল্য জানা যায় এবং মোট জমির পরিমাণের সাপেক্ষে কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণের অনুপাত নির্ণয় করা সম্ভব।

(৩) সাংস্কৃতিক ইকুমেন (Cultural Ecumene):- ভাস্কো-দা-গামা, কলম্বাস কর্তৃক নতুন পৃথিবী আবিষ্কৃত হওয়ার পূর্বে সমগ্র বিশ্বে একটি মাত্রই ইকুমেন ছিল। কেননা তখন কোনোরূপ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতা ছিল না। পরবর্তী সময়ে নতুন বিশ্বে ইকুমেন রাজনীতি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়। সুতরাং সংস্কৃতির পরিবর্তন ইকুমেনের ওপর ফলপ্রসূ এবং ইকুমেনের স্থান পরিবর্তনে তা প্রভাব ফেলে।

(৪) শিল্প ইকুমেন (Industrial Ecumene):- শিল্পবিপ্লব জনবসতি ও জনবসতিহীন উভয় জমিতেই পরিবর্তন এনেছিল। কোনো স্থানে শিল্প গড়ে উঠলে সেখানে নতুন বাসিন্দা ও বসতি গড়ে ওঠে এবং তাকে নির্ভর করে শিল্পভিত্তিক ইকুমেন তৈরি হয়। এই শিল্প ইকুমেনগুলি গ্রাম থেকে শহরে পরিব্রাজনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

→ উপসংহারঃ-

পরিশেষে উল্লেখ্য যে, কেন্দ্রীয় এলাকা (Core Area) ও ইকুমেন (Ecumene) এক নয়। কেন্দ্রীয় এলাকার দুটি অর্থ রয়েছে, একটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে, রাজনৈতিক এলাকার মধ্যে এমন একটি অঞ্চল যেখানে জনসংখ্যা, যোগাযোগ ও সম্পদের কেন্দ্রীয়তা রয়েছে। অপরটি ঐতিহাসিক পটভূমিতে, যেখান থেকে বা যে স্থান থেকে কোনো রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছিল অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিকাশ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে যে ছোট্ট এলাকাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে বর্তমান রূপ ধারণ করে তাই হলো কেন্দ্রভূমি বা কেন্দ্রীয় এলাকা। কিন্তু ইকুমেন হল কোনো রাষ্ট্রের সর্বদা ঘনজনবসতিযুক্ত উন্নত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আভাস সম্পূর্ণ সমৃদ্ধশালী এলাকা। যদিও বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় এলাকা হল ইকুমেন, তবে তা সর্বদা ঠিক নয়। কোনো রাষ্ট্র যে স্থানে গড়ে উঠেছে সেখান থেকে বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে তার যদি সমৃদ্ধশালী এলাকা অন্যত্র পরিবর্তিত হয় তাহলে সেই স্থানটিই হবে ইকুমেন অঞ্চল বা এলাকা।


লেখকঃ- প্রতীক চ্যাটার্জী (কুলটি, পশ্চিম বর্ধমান)
[লেখক আংশিক সময়ের শিক্ষক, ছোটোদিঘারী বিদ্যাপীঠ (এইচ.এস.), নিউটাউন, আসানসোল]


তথ্যসূত্রঃ-

(১) দও, পারমিতা (২০১২), সামাজিক, রাজনৈতিক ও ভারতের আঞ্চলিক ভূগোল, জিও অবজারভিং সোসাইটি

(২) Dwivedi, R.L. (2014), Fundamentals of Political Geography, Chaitanaya Publishing House

© মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া, ভূগোলিকা-Bhugolika, Geography & Environment, স্টুডেন্টস কেয়ার

Students Care

স্টুডেন্টস কেয়ারে সকলকে স্বাগতম! বাংলা ভাষায় জ্ঞান চর্চার সমস্ত খবরা-খবরের একটি অনলাইন পোর্টাল "স্টুডেন্ট কেয়ার"। পশ্চিমবঙ্গের সকল বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের এবং সমস্ত চাকুরী প্রার্থীদের জন্য, এছাড়াও সকল জ্ঞান পিপাসু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গদের সুবিধার্থে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। 

error: স্টুডেন্টস কেয়ার কতৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত !!