বিশেষ নিবন্ধ : ভারতের পক্ষী পরিযান – লেখিকাঃ পৃথা মজুমদার

এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •   
  •  

ভারতের পক্ষী পরিযান

পরিযান (Migration) বাস্তুশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জীবের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বছরের কোন এক সময়ে তাদের পরিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু পরিযানের সময়কাল, দূরত্ব তাদের জীবনের কোন অংশে ঘটবে সেটা একান্তই জীবের অস্তিত্ব রক্ষার উপর নির্ভরশীল। জীবজগতের অন্যান্য প্রাণীদের মতোই পক্ষী পরিযান একটি ঘটনা এবং ভারতে এই পরিযায়ী পাখিদের পরিযান জীববৈচিত্র্যের উপর নিঃসন্দেহে একটি অন্যতম ভূমিকা নিয়ে থাকে।

[লেখা পাঠান এই ইমেলে– [email protected]]

★ পক্ষী পরিযানের কারণঃ-

(১) খাদ্যের অভাবঃ- নিদিষ্ট ঋতুতে বিভিন্ন কারণে যেমন – দূষণ, বন্যা, খরা ইত্যাদির প্রভাবে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে পক্ষী পরিযান ঘটে থাকে।
(২) বংশবিস্তারঃ- পক্ষী শ্রেণির বংশবিস্তার তাদের নতুন প্রজন্মের পরিচর্যা বা সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার জন্য পরিযান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
(৩) আবহাওয়ার পরিবর্তনঃ- বর্তমান কালে বিশ্ব উষ্ণায়ণ, হিমবাহের গলন, সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি, ওজোন স্তরের ক্ষয় বিভিন্ন কারণে আবহাওয়ার পরিবর্তন পক্ষী পরিযানের অন্যতম কারণ।
(৪) প্রজনন ক্ষেত্রের অতিরিক্ত আর্দ্রতাঃ- পাখিদের প্রজননের ক্ষেত্রের আর্দ্রতা যখন অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায় তখন তারা অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়।
(৫) শিকারিদের সংখ্যা বৃদ্ধিঃ- বর্তমান কালের একটি অন্যতম সমস্যা হল চোরাশিকার। এর ফলে জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হয়। এই শিকারিদের থেকে রক্ষা পেতে পাখিরা তাদের নিদিষ্ট স্থান ত্যাগ করে পরিযান করে।
(৬) নতুন প্রাণীদের আক্রমণঃ- কখনো একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির উপর অন্য প্রাণীদের আক্রমণ হয় ফলে তারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পরিযানে বাধ্য হয়।

[প্রবন্ধ প্রতিযোগীতার সকল লেখা পড়ুন এখানে ক্লিক করে]

★ পক্ষী পরিযানের শ্রেণিবিভাগঃ-

(১) ঋতুভিত্তিক পরিযানঃ- যে প্রজনন নির্দিষ্ট ঋতুর সাথে সম্পর্কিত তখন তাকে ঋতুভিত্তিক পরিযান বলা হয়।
(২) অক্ষাংশগত পরিযানঃ- উত্তর অক্ষাংশগত অঞ্চল থেকে দক্ষিণ অক্ষাংশগত অঞ্চল বা দক্ষিণ অক্ষাংশগত অঞ্চল থেকে উত্তর অক্ষাংশগত অঞ্চলে স্থানান্তর কে অক্ষাংশগত পরিযান বলা হয়।
(৩) উচ্চতাগত পরিযানঃ- যে পরিযানে ভূপ্রাকৃতিক উচ্চতা কারণ বিশেষ তাকে উচ্চতাগত পরিযান বলা হয়।
(৪) যাযাবরীয় পরিযানঃ- পাখিরা যখন নিজেদের চেনা জানা জায়গায় কোন নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই পরিযান করে।
(৫) অপসারণ পরিযানঃ- যখন পাখিরা যে স্থানে থাকে সেখানে খাদ্যের অভাব দেখা দিলে তারা অন্য স্থানে চলে যায় এবং কখনোই ফিরে আসে না।
(৬) পার্শ্বীয় পরিযানঃ- যখন একটি প্রজাতির নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক সদস্য অন্য জায়গায় পরিযান করে তাকে পার্শ্বীয় পরিযান বলা হয়।
(৭) প্রজননের জন্য পরিযানঃ- যখন পাখিরা প্রজননের সুবিধার জন্য অন্য জায়গায় পরিযান করে।

★ ভারতের পরিযায়ী পাখিরাঃ-

(১) পরিযায়ী পাখিরা তাদের নির্দিষ্ট প্রয়োজনে যেমন খাদ্য সংগ্রহ বা প্রজননের কারণে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। (২) ভারতীয় পাখিদের ২০০০ প্রজাতির মধ্যে ৩৫০ প্রজাতিই হল পরিযায়ী পাখি। এখানে বেশিরভাগ পরিযায়ী পাখিই শীতকালে আসে। (৩) শীতের দেশের পাখিরা বেশিরভাগ ডিসেম্বর মাস নাগাদ আসে। (৪) ছোট প্রজাতির পাখি গুলি নভেম্বরের শুরুতেই চলে আসে। (৫) খঞ্জনা (Wagtails) প্রজাতির পাখিগুলি অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে আসে। (৬) বিভিন্ন হাঁস জাতীয় পাখিগুলি অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের শুরুতেই ভারতে প্রবেশ করে।

★ ভারতের পরিযায়ী পাখিদের পরিযান পথঃ-

বেশিরভাগ পরিযায়ী পাখিরাই এশিয়া মাইনর, আরব, মধ্য ও উত্তর – পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপ থেকে ভারতে আসে।
ভারতের পরিযায়ী পাখিদের জন্য দুটি উল্লেখযোগ্য পথ হল – পশ্চিমে সিন্ধু অববাহিকা যেখান দিয়ে মধ্য এশিয়া থেকে পরিযায়ী পাখিরা আসেউত্তর পূর্বে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা যেখানে সাইবেরিয়া থেকে পরিযায়ী পাখিরা প্রবেশ করে।

★ ভারতের উল্লেখযোগ্য পরিযায়ী পাখিঃ-

(১) সারস পাখি (White Stork) Ciconia ciconia (২) সাধারণ হাঁস জাতীয় (Common Shelduck) Tadorna tadorna (৩) রাজহাঁস জাতীয় (Bar-headed Goose) Anser indicus (৪) ঈগল জাতীয় (Imperial Eagle) Aquila helica (৫) কালো সারস (Black Stork) Ciconia nigara (৬) কোয়েল জাতীয় (Asian Brown Fly Catcher) Muscicapa dauurica (৭) সাদা খঞ্জনা (White Wagtails) Motocilla alba

★ ভারতের উল্লেখযোগ্য পরিযায়ী পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রঃ-

(১) জিম করবেট জাতীয় উদ্যান (উত্তরাখন্ড) (২) ভরতপুর পাখিরালয় (রাজস্থান) (৩) চিল্কা হ্রদ (ওড়িশা) (৪) সুলতানপুর পাখিরালয় (হরিয়ানা) (৫) নল সরোবর পাখিরালয় (গুজরাত) (৬) কুমারাকম পাখিরালয় (কেরালা)

★ ভারতের পক্ষী পরিযানের বর্তমান পরিসংখ্যানঃ-

(১) ২০১৫ সাল থেকে ৮০% পরিযায়ী পাখি ভারতে প্রবেশ করতে পারে না। আগে ১৫-১৬ প্রজাতির হাঁস প্রতি বছর আসলেও বর্তমানে জলাভূমি দূষণের জন্য সেই সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। (২) পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বিশ্ব উষ্ণায়ণের প্রভাবে পরিযায়ী পাখির প্রবেশ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। (৩) সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা গিয়েছে সারস প্রজাতির ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রায় ৭৫% হ্রাস পেয়েছে। হাঁস প্রজাতির পরিযায়ী যেখানে ২০১৩ সালে ৪০০০-৫০০০ ছিল সেখানে বর্তমানে মাত্র ৪০-৫০ টি দেখতে পাওয়া গেছে।

★ পশ্চিমবঙ্গের পক্ষী পরিযানঃ-

পশ্চিমবঙ্গে পরিযায়ী পাখিরা আসতে শুরু করে মোটামুটি ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে। এরাজ্যের পরিযায়ী পাখি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র গুলি হল —
(১) সাহেব বাঁধ (পুরুলিয়া) (২) বক্রেশ্বর ব্যারেজ (বীরভূম) (৩) বল্লভপুর পাখিরালয় (বীরভূম) (৪) বোটানিক্যাল গার্ডেন (হাওড়া) (৫) সাঁতরাগাছি ঝিল (হাওড়া) (৬) নলবন (সল্টলেক) (৭) চিন্তামনি কর পাখিরালয় ( দক্ষিণ ২৪ পরগনা ) (৮) IIM জোকা
(৯) পূর্বস্থলী (বর্ধমান) (১০) রসিকবিল (কোচবিহার) প্রভৃতি।

★ বর্তমানে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা হ্রাসের কারণঃ-

(১) আবহাওয়ার পরিবর্তনঃ- বিভিন্ন কারণে আবহাওয়া পরিবর্তন হওয়ার ফলে পাখিদের পরিযানের সময়ের সমস্যা দেখা দেয়, তাদের খাদ্যের অভাব দেখা যায়, তাদের জীবনচক্রের সমস্যা হয়।
(২) অনিয়মিত বৃষ্টিপাতঃ- বর্তমানে দেখা যায় বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম ও বর্ষা কাল পরবর্তী সময়ে প্রবল বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাখিরা দূরের পথ উড়ে আসতে সমস্যা হয়।
(৩) পরিযান পথে ফাঁদঃ- পাখিদের উড়ে আসার পথে কিছু মানুষ ফাঁদ পাতছে যার জন্য পরিযায়ী পাখির সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।
(৪) আশ্রয়স্থলের ধ্বংসঃ- পরিযায়ীদের আশ্রয়স্থল দূষণ, বৃক্ষচ্ছেদন, জলাশয় দূষণ,প্লাস্টিক দূষণ ইত্যাদির ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে যার ফলে পরিযায়ী সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।
(৫) পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে চোরাকারবারিঃ- কিছু মানুষ অনিয়ন্ত্রিত ভাবে পরিযায়ী পাখি শিকার করে বাণিজ্য করছে যার ফলে পাখির সংখ্যা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।

★ পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণের উপায়ঃ-

(১) ধর্মীয় বিশ্বাসঃ- মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাস এনে পরিযায়ী পাখি হত্যা বা শিকার বন্ধ করতে হবে।
(২) আইন প্রনয়ণ করাঃ- ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন ১৯৭২ সালে প্রনয়ণ করা হয়। তার মাধ্যমে বন্যপ্রাণী বা অরন্যের ক্ষতিসাধন রোধ করা হয়।
(৩) বিভিন্ন সংরক্ষণ স্থান নির্মাণঃ- পাখিদের আশ্রয়স্থল করে তোলার জন্য বিভিন্ন চিড়িয়াখানা, অভয়ারন্য, জাতীয় উদ্যান নির্মাণ ও সংরক্ষণ করতে হবে।
(৪) দূষণ নিয়ন্ত্রণঃ- বিভিন্ন উপায়ে মানুষকে দূষণের মাত্রা কমাতে হবে।যার ফলে পাখিরা নিজেদের জীবনচক্র সুষ্ঠু ভাবে চালাতে পারে।

সুতরাং, আমরা বলতে পারি যে, আমরা নিজেরাই পারি আমাদের পরিবেশকে পরিশুদ্ধ করতে ও আমাদের ভারতে আবার পরিযায়ী পাখিদের পরিবেশে ফিরিয়ে আনতে,আমরা আমাদের চারপাশের দূষণ, বৃক্ষচ্ছেদন, নগরায়ন নিয়ন্ত্রণ করতে অঙ্গীকার বদ্ধ হই।


লেখিকাঃ- পৃথা মজুমদার (বেহালা, কলকাতা)
[লেখিকা বি.এড -এর ছাত্রী, ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশন ফর উওম্যান, হেস্টিংস্ হাউস]


তথ্যসূত্রঃ- (১) www.birdmigration.in

(২) www.wikipedia.in

(৩) www.bnhs.org

(৪) www.conservationindia.com

(৫) www.dwc.gov.in

© মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া, ভূগোলিকা-Bhugolika, Geography & Environment, স্টুডেন্টস কেয়ার

Students Care

স্টুডেন্টস কেয়ারে সকলকে স্বাগতম! বাংলা ভাষায় জ্ঞান চর্চার সমস্ত খবরা-খবরের একটি অনলাইন পোর্টাল "স্টুডেন্ট কেয়ার"। পশ্চিমবঙ্গের সকল বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের এবং সমস্ত চাকুরী প্রার্থীদের জন্য, এছাড়াও সকল জ্ঞান পিপাসু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গদের সুবিধার্থে আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। 

error: স্টুডেন্টস কেয়ার কতৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত !!