পৃথিবীর দীর্ঘতম বেলেপাথর গুহা আবিষ্কার হল ভারতের মেঘালয়ে

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 20
    Shares

বিশ্বের দীর্ঘতম বেলেপাথরের গুহা ভারতে!

(World’s longest sandstone cave found in Meghalaya)

মেঘালয়ের পূর্বাঞ্চলীয় খাসি পাহাড়ের মৌসিনরাম এলাকার লাটসৌম গ্রামের নিকটবর্তী পৃথিবীর দীর্ঘতম বেলেপাথরের গুহা ক্রেম পুরির (Krem Puri) খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। মেঘালয়ের স্থানীয় খাসি ভাষায় ‘ক্রেম’ এর অর্থ হল ‘গুহা’

মেঘালয় ভারতের উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্য। এই রাজ্যের উত্তর ও পূর্ব দিকে অসম রাজ্য এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র অবস্থিত। মেঘালয় অর্থ ‘মেঘের ভূমি’। মেঘালয়ের রাজধানী শিলং। মেঘালয় মানেই আমরা জানি পৃথিবীর আদ্রতম স্থান চেরাপুঞ্জির মৌসিমরাম। মেঘালয় মানেই আমরা জানি রাবার গাছের শেকড় দিয়েই প্রাকৃতিক সেতু, মেঘালয় মানেই চিত্রানুগ শৈল শহর শিলং। এর সাথে নতুন সংযুক্ত হল বিশ্বের দীর্ঘতম বেলেপাথরের গুহার নামটি। এই সম্পর্কে আলোচনা করার আগে আমরা মেঘালয় সম্পর্কে কয়েকটি বিষয়ে অবগত হয়ে তারপর গুহাটি সম্পর্কে কিছু তথ্য দেবো।

১. মেঘালয়ের রাজধানী শহর শিলং-

 মেঘালয় আসলে একটি ছোটোনাগপুর মালভূমির একটি বিক্ষিপ্ত অংশ, যার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ শিলং। এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গলফ ক্লাবটিও এখানেই অবস্থিত। এই শিলং পাহাড়কে কেন্দ্র করেই রবীন্দ্রনাথ রচনা করেছিলেন তাঁর ‘শেষের কবিতা’। এখানে রয়েছে পাইন অরণ্য, জলপ্রপাত এবং পার্বত্য জলধারার সমারোহ। এক সময় এটি ”প্রাচ্যেও স্কটল্যান্ড’’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮৯৭ সালে এক ভূমিকম্পে শহরটি ধবংস হয়ে যায় এবং এরপর এটিকে পুনরায় গড়ে তোলা হয়। মালভূমি অঞ্চলটির মধ্যে গারো, খাসি, জয়ন্তিকা নামক কিছু পাহাড় ও রয়েছে। এই পাহাড় গুলির উত্তর দিকে শৈল শহরটি অবস্থান করার ফলে জলীয়বাষ্প যুক্ত আদ্র বায়ু পৌঁছাতে পারেনা ফলে শিলং শররে বৃষ্টিপাত হয়ই না, সেই জন্য শিলংএকটি বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল।

২. এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাত্তলিনং

এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাত্তলিনং
চিত্রে মাওলিনং গ্রামের একটি দৃশ্য

শিলং শহর থেকে ৯২ কিলোমিটার দূরের গ্রাম মাওলিনং। ভারত তথা এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। পূর্ব খাসি পাহাড়ের এ মাওলিনং গ্রামকে বলা হয়, ‘ঈশ্বরের নিজস্ব বাগান’। ২০০৩ সালে এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসেবে ঘোষণা করা হয় মাওলিনংকে। এই গ্রামের সম্পর্কে একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে। সেটি হলো- ‘প্রতিবেশীর হিংসায় মালিকের গর্ব’। কারণ, প্রত্যেক গ্রামবাসী মাওলিনং গ্রামের সদস্য হিসেবে নিজেদের নিয়ে গর্ববোধ করেন। এখানে থাইলং নদী শীর্ণ জলধারা নিয়ে পাথরের খাঁজে তৈরি করছেন অপূরূপ শিল্পকর্ম। নানা রঙের বোগেনভিলিয়া ও বিভিন্ন ধরনের দুম্প্রাপ্য অর্কিডে মোড়া  মাওলিনংয়ের সকল পথঘাট। এখানে গেলে দেখবেন প্রত্যেকটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে বেতের তৈরি কৌণিক আকৃতির ডাস্টবিন বসানো রয়েছে।

বেতের তৈরি কৌণিক আকৃতির ডাস্টবিন
চিত্রে দেখছেন বেতের তৈরি কৌণিক আকৃতির ডাস্টবিন

প্রতিটি বাড়ীতে বাগিচা রয়েছে। গ্রামটিতে প্লাস্টিকের যে কোনো ধরনের সামগ্রী নিষিদ্ধ। থাইলং নদীকে এপার থেকে ওপারে বাঁধা দুই গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি হয়েছে লিভিং রুট ব্রিজ বা শেকড় দিয়েই প্রাকৃতিক সেতু ।

লিভিং রুট ব্রিজ
লিভিং রুট ব্রিজ

৩. চেরাপুঞ্জি- মৌসিমরাম

‘বিশ্বের সর্বাধিক বৃষ্টিপাতের স্থান চেরাপুঞ্জির মৌসিমরামে’। এখানে বছরে ১১,৮৭১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। যা চেরাপুঞ্জিতে হওয়া বৃষ্টিপাতের থেকে ১০০ মিলিমিটারেও অধিক। সর্বাধিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত হওয়ার জন্য গিনিস ওয়ার্ল্ড বুক অফ রেকর্ডসে এই গ্রামের নাম রযেছে। এই গ্রামের মানুষরা বেতের তৈরি ছাতার ব্যবহার করেন। এই ছাতার সাহায্যে তারা পুরো শরীরকে ঢেকে নিতে পারেন। ছাতাগুলিকে স্থানীয় ভাষায় ‘কনুপ’ বলা হয়।

মৌসিমরামের বৃষ্টিবহুল গ্রামে ব্যবহূত ছাতাগুলিকে কনুপ বলা বয়
মৌসিমরামের বৃষ্টিবহুল গ্রামে ব্যবহূত ছাতাগুলিকে কনুপ বলা বয়

বাঙালির ভ্রমণ মানচিত্রে চেরাপুঞ্জি একটি আকর্ষণীয় নাম। ১৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই স্থানটির স্থানীয় নাম ‘সোহরা’। অনুচ্চ পাহাড়ের বুক চিরে মসৃণ রাস্তা। চলার পথের সঙ্গী ছোট ছোট গ্রাম, সবুজ উপত্যকা, খণ্ড খণ্ড কৃষিজমি, পাইন গাছের ছায়া, নাসপাতি ও কমলালেবুর বাগান এবং টেবলটপ পাহাড়। এখানে দেখতে পাবেন, প্রায় ১০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের মাথা থেকে অনেক নীচে সটান আছড়ে পড়ছে নহকালিকাই ঝর্নার জল

নহকালিকাই ঝর্না
নহকালিকাই ঝর্না

চেরাপুঞ্জির অন্যান্য দ্রষ্টব্য হল কেইনরেম ফলস, সেভেন সিস্টার ফল, বাংলাদেশ দেখা ভিউ, খো-রামা, সাংকারাংগ পার্ক, মোসামাই ফলস, ডাইনথলেন ফলস, নংগিথিয়াং ফলস প্রভৃতি।

৪. মোসামাই গুহা-

মোসামাই গুহা
মোসামাই গুহা

সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য হল এখানকার মোসামাই গুহা। গুহার ভিতরে প্রাকৃতিক উপায়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা আকৃতির কিছু ভূ-দৃশ্য— কখনও মানুষের মুখ, কখনও বা হাঁস বা পাখি। এই প্রাকৃতিক গুহায় প্রবেশের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে আপনাকে রোমাঞ্চিত করবে। গুহার ভিতরে বৈদ্যুতিন আলোর ব্যবস্থা রয়েছে। কখনও বসে, কখনও সরু ফাঁকের মধ্যে দিয়ে শরীরকে গলিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। গুহার এক মুখ দিয়ে প্রবেশ করে রোমাঞ্চের স্বাদ নিয়ে আর এক মুখ দিয়ে প্রস্থান করে নিতে পারবেন।

৫. প্রাকৃতিক জীবন্ত সেতু

এখানকার বিস্ময়কর ও মূল আকর্ষণ ‘ডবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ’। মোটামুটি ৫০০ বছর আগে থেকেই এতদঞ্চলে এসব সেতু নির্মাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। এলাকার খাসিয়া-জয়ন্তিয়া আদিবাসীরা দীর্ঘজীবী গাছের শেকড় দিয়েই তৈরি করে আসছে এইসব জীবিত সেতু। একেকটি সেতু নির্মাণ করতে এদের সময় লেগে যায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর। যার ওপর দিয়ে ৫০ জন মানুষ একবারে হেঁটে যেতে পারে, এবং যার কোনো কোনোটি ১০০ ফুটের চেয়েও বেশি লম্বা হয়। যত দিন যায় তত পুষ্ট হতে থাকে গাছের শেকড়, শক্ত হতে থাকে সেতুর শরীর। জীবন্ত সেতুগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে নংগ্রিয়াত গ্রামের কাছে উমশিয়াং নদীর ওপর তৈরি একটি দ্বিতল সেতু যা ‘উমশিয়াং ডবল-ডেকার’ সেতু নামে পরিচিত। এই সেতুর বয়স ২০০ বছরেরও বেশি। রবার গাছের শিকড় পেঁচিয়ে এই সেতুর সৃষ্টি। মেঘালয় ছাড়া পৃথিবীতে কোথাও আর এই অসামান্য প্রাকৃতিক শৈলী দেখা যায় না।

‘উমশিয়াং ডবল-ডেকার’ সেতু
‘উমশিয়াং ডবল-ডেকার’ সেতু

৬. নারটিয়াংয়ের মনোলিথ পার্ক-

নারটিয়াংয়ের মূল আকর্ষণ মনোলিথ পার্ক।
নারটিয়াংয়ের মূল আকর্ষণ মনোলিথ পার্ক।

নারটিয়াং মেঘালয়ের জয়ন্তিয়া পাহাড়ের এক বিউটি স্পট। নারটিয়াংয়ের মূল আকর্ষণ মনোলিথ পার্ক। পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা মনোলিথটি এই পার্কেই আছে। স্থানীয়ের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে- বীর যোদ্ধা ‘মার ফালিঙ্কি’ এক হাতে খাড়া করে বসিয়েছিলেন এই মনোলিথটি। এটি ৮ মিটার লম্বা, ২ মিটার চওড়া এবং ৪৬ সেন্টিমিটার মোটা।

৭. উমংগট নদী, ডাওকি

এই নদীর জল এতটাই পরিষ্কার যে নদীর ওপর দিয়ে ভাসমান নৌকা গুলিকে দেখলে মনে হবে যেন নৌকাগুলি নদীর জলে নয় বরং আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে।

দাওকি নদী
ছবি দেখে মনে হচ্ছে নৌকাটি আকাশে মনে খুশিতে ভেসে বেড়াচ্ছে!!

৮. মেঘালয়ের গুহা

  • ক্রেম পুরি (Krem Puri) 

এগুলির মধ্যে মেঘালয়ের মুকুটে নতুন সংযোজন বিশ্বের দীর্ঘতম বেলেপাথর গুহা। মেঘালয় তে বর্তমানে বেশ কিছু চুনাপাথরের গুহা রয়েছে। সেগুলির সাথে এই বেলে পাথরের গুহাটি পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহর অবকাশ থাকেনা।

দীর্ঘতম বেলেপাথর গুহা
বিশ্বের দীর্ঘতম বেলেপাথর গুহা

পৃথিবীর দীর্ঘতম বেলেপাথর গুহায় ২৪,৫৮৩ মিটার দীর্ঘ। প্রত্নতত্ত্ববিদদের অনুমানুসারে গুহা ব্যবস্থাটি ডাইনোসর জীবাশ্মের সাথে মিল রয়েছে, প্রায় ৬৬-৭৬ মিলিয়ন বছর আগের বিশেষ করে মেসোসরাসের সাথে খুব মিল পাওয়া যায়। পাহাড়ের নীচে লুকিয়ে থাকা একটি জটিল প্রকৃতির গুহা ব্যবস্থা এটি।

মেসোসরাস
ছবিটি মেসোসরাসের (সূত্র)

গুহাটি ২০১৬ সালের প্রথম খোঁজ পাওয়া গেলেও, সেই সময় গুহাটির আসল দৈর্ঘ্য পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছিল না। Meghalaya Adventurers’ Association (MAA) তত্বাবধানে এর আসল দৈর্ঘ্য পরিমাপ করা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার ‘কুইভা এল সামান’ (১৮,২০০ মিটার) বিশ্বের বর্তমান সর্বোবৃহৎ তালিকাভূক্ত গুহা্র তুলনায় এটি প্রায় ৬,০০০ মিটার দীর্ঘ।

২০০২ সালে তেনজিং নোরগে জাতীয় সাহসীকতার পুরস্কার প্রাপক, MAA-র সাধারণ সম্পাদক ‘Kharpran’ বলেন-

“This sandstone cave has also become India’s second longest cave in the general category after the limestone Krem Liat Prah-Umim-Labit system measuring a little over 31km in Jaintia Hills in Meghalaya,”

Brian Khapran Daly- ১৯৯৪ সাল থেকে মেঘালয়ের বিভিন্ন স্থানে গুহার খোঁজ চালিয়ে গিয়েছেন এবং মানচিত্র বানিয়েছেন। এছাড়াও এই দলে ছিলেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৩০ জন গুহা বিশেষজ্ঞ, ইতালি থেকে চার জন এবং MAA-র বাকি সদস্যবৃন্দ।

এই গুহাটি পরবর্তীকালে সরকারিভাবে বিশ্ব রেকর্ডের মর্যাদা পাবে কি পাবে না সেই বিষয়ে জানার জন্য আমাদের আরও হয়ত কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

তথ্য সংগ্রহে- স্টুডেন্টস কেয়ার

তথ্য সূত্র- 

General Knowledge

www.northeasttoday.in

www.cntraveller.in

আনন্দবাজার পত্রিকা

ধন্যবাদ সকলকে। পাঠকগণদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ মতামত জানার আগ্রহে থাকলাম। আপনারা নিচের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করে যে কোনো ধরণের মতামত আমাদের প্রদান করতে পারেন, আমরা সেগুলি আনন্দের সঙ্গে গ্রহন করব।

বিঃ দ্রঃ পরবর্তীতে যদি কোনো তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে সময়ের সাথে সাথে পোস্টটি আপডেট হতে থাকবে। আপনারাও আমাদের তথ্য দিয়ে মেল করতে পারেন ([email protected])। আমাদের ফেসবুক পেজ লাইক করুন এখানে ক্লিক করে।

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 20
    Shares
error: স্টুডেন্টস কেয়ার কতৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত !!