পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলা জারকন || জানুন পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলার সকল রহস্য!

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 185
    Shares

পরিচ্ছেদসমূহ

পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলা জারকন

ভারতে আবিষ্কার হল প্রাচীনতম জারকন শিলা

পৃথিবীর বয়স আনুমানিক ৪৬০ কোটি বছর। পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলা জারকন এর (আগ্নেয় শিলা দ্বারা গঠিত প্রাচীন খনিজ) সন্ধান মিলেছে ভারতে। পূর্ব ভারতের ওড়িশা রাজ্যের চম্পুয়ায় পাওয়া গ্রানাইট আগ্নেয় শিলায় খনিজ জারকনের বয়স আনুমানিক ৪২৪ কোটি বছর। যার কৃতিত্বের ভাগীদার দুই বাঙালি ভূবিজ্ঞানী। যার পুরোভাগে রয়েছেন মালয়েশিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বের শিক্ষক, রজত মজুমদার ও তাঁরই ছাত্রী সিএসআইআর-এর গবেষক ত্রিস্রোতা চৌধুরী। ৪ মে ২০১৮ তে ‘নেচার’ পত্রিকার প্রবন্ধে ওই গবেষণার কথা প্রকাশিত হওয়ার পরই আলোড়ন শুরু হয়েছে বিশ্ব জুড়ে।

[আরও পড়ুন- চালু হচ্ছে চার বছরের B.ed কোর্স]

♠ জারকন আসলে কী?

রত্ন পাথর জারকন পাথর। বিভিন্ন রঙের হয়ে থাকে। তবে সাদা এবং নীল জারকন সব থেকে বেশী ব্যবহার হয়ে থাকে। এর রাসায়নিক নাম ‘জারকোনিয়াম সিলিকেট’ (ZrSio4)। সাদা জারকন পাথরকে শুক্র গ্রহের পাথর বলা হয়ে থাকে। আর নীল জারকন কে শনি গ্রহের পাথর বলা হয়ে থাকে। যা হীরার পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে বৃষ ও তুলা রাশির জন্য উপকারী পাথর সাদা জারকন। জ্যোতির্বিদ্যার ভাষায় এর উপকারিতা নিম্নরূপ-

[আরও পড়ুন- ভারতের এই ট্রেন এখন ব্রিটিশ কে ট্যাক্স দিয়ে থাকে]

১. শুক্র গ্রহ সৌন্দর্য ও আভিজাত্যর প্রতীক ফলে জারকন পাথর ব্যবহারে সৌভাগ্য, সৌন্দর্য ও সম্পদ বৃদ্ধি পায়।

জারকন খনিজ
রত্ন পাথর জারকন পাথর

২. ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বিশেষ উপকারী।

৩. জারকন সম্পর্কের মধ্যে আনন্দ, ভালোবাসার জন্ম দেয়। বৈবাহিক জীবনেও এর প্রভাব রয়েছে।

৪. যে সকল মানুষ সঙ্গিত, অভিনয়, জনসংযোগ, চিত্রশিল্প অথবা লেখালেখির সাথে জড়িত তাদের জন্য জারকন খুব খুব উপকারী।

৫. জারকন পাথর শয়তানের খারাপ প্রভাব, ভয় ভিতি দূর করে আত্ম বিশ্বাস বৃদ্ধি করে।

৬. ঘুমের মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখা থেকে রক্ষা করে জারকন পাথর এবং প্রশান্তির ঘুমে সাহায্য করে।

৭. এ পাথর হজম শক্তি বৃদ্ধি করে এবং শরীর সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

৮. মধ্য যুগ থেকেই মনে করা হয় জারকন পাথর প্রশান্তির ঘুম, উন্নতি, সম্মান এবং ইচ্ছা শক্তি বৃদ্ধি করে।

[আরও পড়ুন- ভারতে চালু হচ্ছে হাইপারলুপ ট্রেন ব্যবস্থা]

♠ কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে এই জারকন খনিজ?

জারকন পাওয়া গিয়েছে আগ্নেয়শিলার মধ্যে। ভূগর্ভের গলিত ম্যাগমা যখন উপরে উঠে এসে জমাট বেঁধে আগ্নেয়শিলা তৈরি করে তখন তার মধ্যে অনেক খনিজ উপাদান গুলিও জমাট বেঁধে যায়, যার মধ্যে একটি হল জারকন। আগ্নেয়শিলার মধ্যে মোনাজাইট ও অন্যান্য অনেক সিলিকেট খনিজও থাকে, কিন্তু সবার মধ্যে জারকনের স্থায়িত্ব অনেক বেশি। তাছাড়া জারকন চাপ ও তাপ প্রতিরোধী। আগ্নেয়শিলার ক্ষয় হলেও এর ভিতরে থাকা জারকন অবিকৃত থাকে, তাই এই খনিজের উপর গবেষণার মাধ্যমে জানা যায় লাভা জমাট বেঁধে আগ্নেয়শিলাটি তৈরি হয়েছিল।

পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক হিলের জারকনের সাথে পূর্ব ভারতের জারকানের তফাৎ কী?

জ্যাক হিলের জারকন মানচিত্র
মানচিত্রে অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক হিল অঞ্চল দেখানো হয়েছে

দুটি স্থানের জারকানের মধ্যে বেশ কিছু তফাৎ রয়েছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক হিলে যে জারকনের খোঁজ মিলেছিল সেটি মূলত ছিল পাললিক শিলার মধ্যে। পাললিক শিলার মধ্যে পাওয়া জারকনকে বলা হয় ‘ডেট্রিটাল জারকন’। কিন্তু, ভারতে যে জারকন পাওয়া গিয়েছে সেটি সরাসরি আগ্নেয়শিলা থেকে প্রাপ্ত। লাভা জমাট বেঁধেই এই শিলা ও খনিজের উৎপত্তি হয়েছে। এটিকে বলা হয় ‘ম্যাগমাটিক জারকন’। ডেট্রিটাল জারকন শিলাচক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন যুগে তার প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু ‘ম্যাগমাটিক জারকন’ কোনও রকম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়নি। তাই বয়সের দিক থেকে অস্ট্রেলিয়ার জারকন প্রাচীন হলেও ভূবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী আগ্নেয়শিলা থেকে সরাসরি পাওয়া খনিজগুলির মধ্যে এই জারকনই সবচেয়ে বেশি পুরনো। সে দিক থেকে বিচার করে এই খনিজকে বিশ্বের প্রাচীনতম খনিজ বলা হচ্ছে।

ভূবিজ্ঞানী রজত মজুমদার
ভূবিজ্ঞানী রজত মজুমদার

ডঃ মজুমদারের মতে-

“The Singhbhum rock from where the zicron was recovered is the second oldest and its zircon, the oldest magmatic zircon on earth,” (সূত্র- দ্য হিন্দু)

♠ শিলার বয়স কিভাবে নির্ণয় করা হয়?

পৃথিবী তথা কোনো শিলা কত বছর বয়স সেটি কিভাবে নির্ণয় করবো? এই প্রশ্নের উত্তরের সাপেক্ষে ‘হটনের’ একটি বাক্য মনে পরে গেলো- “Present is the key to the past”, অর্থাৎ “বর্তমান হল অতীতের চাবকাঠি”। লাইনটিকে পর্যালোচনা করলে যানা যায়- বর্তমান কে জানার মাধ্যমে অতীতের ঘটনাবলি সম্পর্কে আলোকপাত করা সম্ভব। বর্তমানে ভূমিরূপ, শিলার স্তরায়ন, শিলার জীবাশ্মের উপস্থিতি, শিলাস্তরের গ্রথন প্রভৃতির বিশ্লেষণের দ্বারা অতীতের শিলা সৃষ্টির বয়স, ওই সময়ের জলবায়ু প্রভৃতির সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানলাভ করা যায়।

জারকন শিলা
ভারতে প্রাপ্ত বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম শিলা এবং বিশ্বের প্রাচীনত ম্যাগমাটিক শিলা।

♦ সাধারণত ভূ-তাত্ত্বিক বয়স দুটি ভাবে নির্ধারণ করা যায়-

১) আপেক্ষিক বয়স বা Relative Age- এই প্রকার বয়স অপর কোনো সময় বা ঘটনার প্ররিপেক্ষিতে নির্ণয় করা হয়। উদাহরন হিসাবে বলা যেতে পারে-

অ) জীবাশ্মের ভিত্তিতে সময় বা বয়স নির্ণয়

আ) উদ্ভিদের কান্ডের বর্ষবৃত্ত থেকে বয়স নির্ণয়; একে আমরা ডেন্ড্রোক্রোনোলজি ও বলে থাকি।

ই) ভূ-তাত্ত্বিক স্তরায়ন বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিলার বয়স নির্ণয় করা যায়।

ঈ) ভাঁজ বা ফাটলের বিস্তৃতি থেকে বয়স নির্ণয় করা যায়।

উ) সমুদ্রতলের বিস্তার ও পুরাচুম্বকিয় বিশ্লেষণ প্রভৃতি।

[আরও পড়ুন- ভারতে আবিষ্কার হল বিশ্বের দীর্ঘতম বেলেপাথরের গুহা]

২. প্রকৃত বয়স (Absolute Age)- এই ধরনের বয়স অন্য কোনো ঘটনা বা সময়ের সাপেক্ষে পরিমাপ করা হয়না, বরং “ভূতপূর্ব এত বছর” এভাবে নির্ণয় করা হয়। এরূপ বয়স নির্ণয় করার জন্য-

অ) তেজস্ক্রিয় ডেটিং

আ) কার্বন- ১৪

ই) ইউরেনিয়াম ডেটিং প্রভৃতির সাহায্য নেওয়া হয়।

সুনির্দিষ্টভাবে সময় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন একধরণের ভূতাত্ত্বিক ঘড়ির, যা আমাদেরকে বলে দিবে পৃথিবীর বিভিন্ন শিলাস্তরের কবে তৈরি হয়েছিলো আর কোন প্রাণী বা উদ্ভিদের ফসিলটির বয়সই বা কত। আর বিজ্ঞানীরা সেটাই খুঁজে পেলেন বিভিন্ন ধরণের তেজস্ক্রিয় (Radioactive) পদার্থের মধ্যে, এই ভূতাত্ত্বিক ঘড়িগুলোকে বলা হয় রেডিওমেট্রিক ঘড়ি। কারণ, তারা প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তার মাপ থেকে আমাদেরকে সময়ের হিসেব বলে দেয়।

♦ পাললিক শিলাস্তরের এই জীবাশ্ম গুলোর বয়স কিভাবে নির্ধারণ করা হয়?

অনেক শিলাস্তরে বিশেষ করে আগ্নেয় শিলাস্তরে প্রচুর পরিমাণে ইউরেনিয়াম, পটাসিয়াম জাতীয় তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায়। আবার পাললিক শিলার মধ্যে তেমন কোন তেজস্ক্রিয় পদার্থের অস্তিত্বই থাকে না। কিন্তু আমরা জানি যে, আগ্নেয় শিলায় ফসিল সংরক্ষিত হয় না, ফসিল পাওয়া যায় শুধু পাললিক শিলাস্তরে। তাহলে পাললিক শিলাস্তরের এই ফসিলগুলোর বয়স কিভাবে নির্ধারণ করা হয়? এক্ষেত্রে আপেক্ষিক এবং পরম দু’টো পদ্ধতিই ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রথমে পাললিক শিলা স্তরের উপরে এবং নীচে যে আগ্নেয় শিলাস্তর দু’টো তাকে স্যান্ডুইচের মত আটকে রেখেছে, তাদের বয়স নির্ধারণ করা হয়। এখান থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে মধ্যবর্তী পাললিক শিলাস্তরে সংরক্ষিত ফসিলের বয়স এই দুই আগ্নেয় শিলাস্তরের বয়সের মাঝামাঝিই হবে। এখন যদি দেখা যায় যে, ফসিলটির নিজের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ আটকে গেছে তাহলে তেজস্ক্রিয় ডেটিং -এর মাধ্যমে ফসিলটির বয়স সরাসরিই নির্ধারণ করা যেতে পারে। সরাসরি ফসিলের বয়স হিসেব করার জন্য তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রেডিও-কার্বন ডেটিং হচ্ছে অত্যন্ত বহুলভাবে ব্যবহৃত আরেকটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতি দিয়ে শিলাস্তরের বয়স নয়, ফসিলের মধ্যে মৃত টিস্যুরই বয়স সরাসরি নির্ধারণ করে ফেলা যায়। কয়েক হাজার বছরের অর্থাৎ ভূতাত্ত্বিক সময়ের বিচারে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালের ইতিহাস জানার জন্য এই পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে মানুষ এবং তার পূর্বপুরুষদের ফসিলের বয়স নির্ধারণে ব্যাপকভাবে রেডিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

[আরও পড়ুন- ভারতের অজানা ২২টি তথ্য]

♠ জারকানের বয়স কোন্‌ পদ্ধতিতে নির্ণয় করা সম্ভব হল?

আমরা আগেই জেনেছি জারকন আগ্নেয়শিলা গ্রানাইটের ভিতর পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে ইউরেনিয়াম, পটাসিয়াম, লেড-সহ একাধিক তেজস্ক্রিয় উপাদান এর অবস্থান থাকে। তেজস্ক্রিয় ডেটিং, অর্থাৎ ইউরেনিয়াম ও লেডের অনুপাত বিশ্লেষণ করে ওই শিলার বয়স জানা যায়। অর্থাৎ জারকনের ভিতরে থাকা তেজস্ক্রিয় পদার্থের অনুপাত থেকেই জানা গিয়েছে এই খনিজের বয়স প্রায় ৪২৪ কোটি বছর।

যেহেতু বাইরের চাপ ও তাপে শিলার ভিতর থাকা অন্যান্য খনিজের ক্ষয় হলেও জারকনের বিশেষ কোনও পরিবর্তন হয় না সেহেতু এই খনিজকে বিশ্লেষণ করে সহজেই জানা যায় ঠিক কত বছর আগে লাভা জমাট বেঁধে আগ্নেয়শিলাটি তৈরি হয়েছিল।

♠ প্রাচীন খনিজ জারকান আবিষ্কারের পেছোনে কাদের অবদান রয়েছে?

জারকান খুঁজে পাওয়ার পেছনে দুইজন বাঙালী বিজ্ঞানির অবদান রয়েছে। প্রথমজন হলেন রজত মজুমদার এবং তাঁরই ছাত্রী সিএসআইআর-এর গবেষক ত্রিস্রোতা চৌধুরী।

১. রজত মজুমদার- রজত মজুমদার স্যারের কলেজে পড়ার সময় থেকেই শিলা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। তিনি বিজ্ঞানের প্রতি আসক্তির ফলে নানান বিজ্ঞানপত্রিকা নিয়ে নিয়মিত চর্চা করতাম। দুর্গাপুর গভর্নমেন্ট কলেজে পড়ার সময়েই বিহারের সিংভূম, ঝাড়খণ্ড ও ওডিশার নানা জায়গায় শিলার খোঁজে ঘোরাঘুরি করে প্রাথমিক ধারনা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর ২০০৬ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিউটে অধ্যাপনা করার সময়েই শিলার উপর গবেষণার কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর ২০০৯ সালে ইউনেসকো-র সহযোগিতায় পুরনো পাথর ও খনিজ সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। ছাত্রী ও গবেষক ত্রিস্রোতা চৌধুরী কে নিয়ে ২০১০ সালে ওডিশার নানা জায়গায় অনুসন্ধানের কাজ শুরু করেন। অবশেষে ওডিশার চম্পুয়ায় গ্রানাইট আগ্নেয়শিলার মধ্যে এই জারকনের খোঁজ পাই।

ওডিশার চম্পুয়ায়। (বাঁ দিক থেকে) ত্রিস্রোতা চৌধুরী ও রজত মজুমদার।
ওডিশার চম্পুয়ায়। (বাঁ দিক থেকে) ত্রিস্রোতা চৌধুরী ও রজত মজুমদার।

২. ত্রিস্রোতা চৌধুরী- শৈশবের কিছুদিন কেটেছে দুর্গাপুরে। স্কুল জীবন শুরু সেখানেই। এরপর মালদা, মুর্শিবাদ–সহ একাধিক জেলায়। স্কুল শেষ করে জিওলজি বিষয় নিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি–তে ভর্তি। সেখান থেকেই এমএসসি। ২০১০–এ এমএসসি পাশ করে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইন্সটিটিউটে গবেষণায় যোগ। শিক্ষক হিসেবে পান মালয়েশিয়ার কারটিন ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্বের অধ্যাপক ডঃ রজত মজুমদারকে। তাঁর তত্ত্বাবধানেই পাথরের প্রাচীনত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু। অতঃপর জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে। সেখানে রজতবাবুর  তত্ত্বাবধানেই ব্যাপকভাবে ওড়িশার কেওনঝড়ের চাম্পুয়ায় কাজ শুরু। সেখানেই আবিষ্কার।

♠ এই বিষয়ে কি আরও অন্যান্য গবেষণার কাজ হয়েছে?

আইআইটি, সিএসআইআর হায়দরাবাদ, আইআইএসইআর (আমদাবাদ) ও বেঙ্গালুরু আইআইএসসি-তে এমন অনেক ভূবিজ্ঞানী এবং ভূবিশারদ রয়েছেন যাঁরা এই ভূতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছেন। এর আগে কানাডার ভূবিজ্ঞানীরা ৪২০ কোটি বছরের পুরনো ম্যাগমাটিক জারকনের খোঁজ পেয়েছিলেন। চিন ও ব্রাজিলের গবেষণায় উঠে এসেছিল ৪০০-৪১০ কোটি বছরের পুরনো জারকন। কিন্তু, ওডিশায় এই প্রথম ৪২৪ কোটি বছরের পুরনো জারকনের খোঁজ মিলল।

♠ প্রায় তিন দশক আগেও কি প্রাচিন শিলার খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল?

বিভিন্ন সূত্র অনুসারে প্রায় তিন দশক আগেও একবার চেষ্টা হয়েছিল। ১৯৮১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্সি কলেজের ভূতত্ত্বের দুই শিক্ষক আশিসরঞ্জন বসু এবং অজিতকুমার সাহা পূর্ব ভারতের এই আগ্নেয় পাথরের বয়স ৩৮০ কোটি বছর বলে দাবি করে ‘সায়েন্স’ পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী সেই দাবির বিরোধিতা করে জানিয়েছেন, বাঙালি গবেষকদের হিসেবে গড়মিল রয়েছে, ওই আগ্নেয় পাথরটি ৩৩০ কোটি বছরের পুরনো। পরে নানা বিতর্কের মুখোমুখি হয়ে ১৯৯৫ সালে আমদাবাদের ভূতত্ত্বের অধ্যাপক জে এন গোস্বামী ও অজিতকুমার সাহা দাবি করেন, ৩৮০ কোটি নয়, বরং শিলাটির বয়স ৩৫০ কোটি বছর। সুতরাং এই শিলাটি পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলার তালিকায় পড়ে না।

♠ শিলা বিশ্লেষণের জন্য চিনের বিজ্ঞানীর সাহায্য কেন নিতে হল?

এই শিলার বিশ্লেষণের খনিজের খোঁজ পেতে দরকার ‘সেন্সিটিভ হাই রেজলিউশন আয়ন মাইক্রোস্কোপ’ (SHRIMP) তা আমাদের দেশে নেই। শিলা বিশ্লেষণ করে শিলাটি নিয়ে গবেষণার জন্য পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার, পার্থের ভূবিজ্ঞানীদের সাহায্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা কোনও রকম সহযোগিতা করেননি। এরপর কানাডা ও জাপানের বিজ্ঞানীরাও শিলা নিয়ে পরীক্ষা করতে রাজি হননি। সেই সময় বেজিংয়ের শ্রিম্প সেন্টারের ভূবিজ্ঞানী ইউশেন ওয়ানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ইউশেন তাঁর গবেষণাগারে শিলার বিশ্লেষণ করেন এবং সব তথ্য প্রদান করেন।

সেন্সিটিভ হাই রেজলিউশন আয়ন মাইক্রোস্কোপ
সেন্সিটিভ হাই রেজলিউশন আয়ন মাইক্রোস্কোপ

♠ ভূবিজ্ঞানের কোন অজানা দিক উঠে আসবে এই গবেষণায়?

এই নতুন আবিষ্কারের সম্পর্কে রজত মজুমদার বাবুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল; ভূবিজ্ঞানের কোন অজানা দিক উঠে আসবে এই গবেষণায়? উত্তরে রজত বাবু জানান

“পৃথিবীর ‘অন্দরমহল’-এ যে অজানা রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, এই গবেষণা সেই অচেনা আঁধারেই নতুন আলোর দিশা দেখাচ্ছে। এই ম্যাগমাটিক জ়ারকন থেকে জানা যাচ্ছে, পৃথিবী সৃষ্টির আদিম পর্যায়ে ভূস্তরের ম্যান্টল থেকে গলিত লাভাস্রোত বেরিয়ে ভূত্বক বা ক্রাস্ট-এ এসে জমাট বেঁধে ওই শিলা তৈরি করেছে। সেই সময় ম্যান্টল ছিল পরিবর্তনশীল। বারে বারেই জমাট বাঁধা লাভা ভেঙেচুরে নানা ধরনের শিলায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই খনিজের বিশ্লেষণ ভূস্তরের গঠন সম্পর্কেও একটা নিশ্চিত ধারণা দেয়।

খনিজের অক্সিজেন আইসটোপ বিশ্লেষণ করে ভূপৃষ্ঠে প্রথম জলের উত্পত্তির ইতিহাস, টেকটোনিক প্লেটের চলন-সহ নানা দিক নিয়ে গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে যাবে বলে আমি মনে করি”।(সূত্র- আনন্দবাজার পত্রিকা)

লেখার সমর্থনে তথ্যসূত্র-

আনন্দবাজার পত্রিকা

আজকাল

 

জারকনের মধ্যে কি লুকিয়ে রয়েছে পৃথিবী সৃষ্টির আদি রহস্য? গনগনে লাভা স্রোত থেকে উঠে আসা এই খনিজের বৈশিষ্টই বা কী? বাঙালি বিজ্ঞানীদের হাত ধরেই কি খুলবে রহস্যের জট? পৃথিবীর প্রাচীনতম শিলা জারকন

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 185
    Shares
error: স্টুডেন্টস কেয়ার কতৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত !!