মুম্বাই এর জুহুর জ্বলজ্বলে সমুদ্র সৈকত || জানুন আসল রহস্য

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 2
    Shares

মুম্বাইয়ের জুহুর জ্বলজ্বলে সমুদ্র সৈকত সৃষ্টির কারণ কী?

আমরা আজকে আলোচনা করব, মুম্বাই এর সমুদ্র সৈকত ( মুম্বাই এর জুহুর জ্বলজ্বলে সমুদ্র সৈকত ) রাতের বেলা চকচকে আলোর মত ঝলমল করে কেন। কি কারণ রয়েছে এর পেছনে সেটাই আজ আলোচনা করব। কারণ গুলিকে বিস্তারিত আলোচনা করার জন্য আমরা সম্প্রতি গবেষণা লব্ধ ফলাফলকে আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। তার আগে একটু জেনে নেই এই ঝলমলে আলোর ব্যপারে। এবং কোথায় কোথায় এই ধরণের প্রদীপ্ত সমুদ্র সৈকত দেখা যায় সেই ব্যপারে একটু জেনে নেওয়া ভালো।

রাতে মুম্বাইয়ের জুহু সমুদ্র সৈকতের দৃশ্য
রাতে মুম্বাইয়ের জুহু সমুদ্র সৈকতের দৃশ্য

প্রদীপ্ত সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লক্ষ করা যায়। যেমন ধরুন- মালদ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, পুয়ের্তোরিকো, জামাইকা প্রভৃতি দেশে এই ধরণের সমুদ্র সৈকত দেখা যায়। এবং এই সমুদ্র সৈকত সৃষ্টির কারণ হিসাবে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন অবস্থান কে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফাইটোপ্লাঙ্কটনের নাম ডিনোফ্লাজেলাটিস।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এই বায়োলুমিনিসেন্স বা জীব দ্যুতি দেখা যায়
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এই বায়োলুমিনিসেন্স বা জীব দ্যুতি দেখা যায়

ব্যপারটা বুঝলেন না নিশ্চই অনেকে? একটু বুঝিয়ে বলি, আপনারা নিশ্চই অস্কার পুরস্কার প্রাপ্ত হলিউড সিনেমা ‘অভতার’ দেখেছেন, যদি দেখে থাকেন তাহলে লক্ষ করবেন একটি দৃশ্য রয়েছে যেখানে বিভিন্ন ধরণের জীব রাতের বেলা নিজের দেহের আলোর মাধ্যমে সম্পূর্ণ এলাকাটিকে ঝলমলে করে তুলেছে। ঠিক একি ভাবে পৃথিবীর এমন কয়েকটি সমুদ্র সৈকত রয়েছে যেখানে এই ধরণের কিছু জীব থাকার ফলে সমুদ্র সৈকত চকচকে আলোর মত দেখায়।

ডিনোফ্লাজেলাটিস
ডিনোফ্লাজেলাটিস

ঠিক একিরকম কিছু দৃশ্য লক্ষ করা যাচ্ছে ভারতের মুম্বাইয়ের জুহু সমুদ্র সৈকতে। এবার হয়ত আপনাদের মনে প্রশ্ন আসছে যে, ভারতে এই ধরণের দৃশ্য কেন দেখা যাচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য বিজ্ঞানীরা কয়েকবছর ধরেই গবেষণা করে চলেছেন। এবং সময়ের সাপেক্ষে দুটি কারণ উঠে এসেছে।

১. সমুদ্র উপকূলের দূষণ-

কয়েক বছর আগে একটি গবেষনা লব্ধ ফলাফলে দাবী করা হয়েছিল যে, কিছু ধরণের অ্যালগি রয়েছে, যাদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং এই অ্যালগি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হিসাবে সেই সময় সমুদ্র উপকূল দূষণ কে দায়ী করা হয়েছেল। কয়েক বছর আগে বিজ্ঞানীরা দাবী করেছিল, মুম্বাইয়ের শিল্পাঞ্চলের দূষিত পদার্থ সমুদ্র কে দূষিত করার ফলে এই ধরণের  অ্যালগির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

২. বিশ্ব উষ্ণায়ন-

সম্প্রতি Indian National Centre for Ocean Information Services (INCOIS),  Ministry of Earth Sciences (MoES) এবং আমেরিকার National Oceanic and Atmospheric Administration (NOAA)-র মিলিত গবেষণায়, বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন  কোনোরকম দূষণ নয়, বরং ‘বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মুম্বাইয়ের জুহু সমুদ্র সৈকতে এই ধরণের চকচকে আলোর দেখা মিলছে’

বিশ্ব উষনায়ন কি?

বিগত কয়েক দশকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরো ফ্রুরোকার্বন ইত্যাদি গ্রিন হাউস গ্যাসগুলির প্রভাবে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা উষ্ণতার ক্রমবর্ধমান অবস্থানকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে।

বায়োলুমিনিসেন্স বা জীব দ্যুতি কী?

জীব দেহ হতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আলো নিঃসৃত হওয়ার ঘটনাকে বায়োলুমিনিসেন্স (bioluminescence) বা জীব দ্যুতি বলে। সমুদ্রের 200-1000 মিটার গভীরতার কিছু জীবের দেখা মেলে যারা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের দেহে আলো তৈরি করতে পারে । এরা হল বায়োলুমিনিসেন্টজীব । এই জীবেরা আলো তৈরির জন্য যে ধরণের রাসায়নিক পদার্দ ব্যবহার করে তাকে ‘লুসিফেরিন’ বলে। এবং এই আলো তৈরির প্রক্রিয়া কে বায়োলুমিনিসেন্স বলা হয়।

বায়োলুমিনিসেন্স বা জীব দ্যুতি
বায়োলুমিনিসেন্স বা জীব দ্যুতি এই ভাবেই আলোকিত করে

স্থলজ ও জলজ উভয় প্রকার প্রাণীতে এই রকমের দ্যুতি বা আলো দেখা যায়। যেমনঃ জোনাকি পোকা। বিজ্ঞানীদের মতে এই সকল প্রাণীদের দেহে দু’ধরনের রাসায়নিক পদার্থ লুসিফেরিন ও লুসিফারেজ থাকে যা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া করে আলো উৎপন্ন করে। এই আলোই এই সমস্ত জীবেদের খাবার খোঁজা, খাদ্যকে আকর্ষণ করা, ছদ্মাবেশ ধারণ, আত্মরক্ষা ইত্যাদিতে সাহায্য করে ।

‘নকটিলুকা’ অ্যালগি

নকটিলুকা অ্যালগি সাধারণত sea tinkle নামে বেশি পরিচিত। এটি মুম্বাইয়ের উপকূলের কাছে উত্তর আবর সাগরে। আর এর একটি বৈশিষ্ট বায়োলুমিনিসেন্স। অর্থাৎ রাতের বেলা এই অ্যালগি থেকে আলো জ্বলে ওঠে। এই জন্য একে sea sparkle বলা হয়।

বিশ্ব উষ্ণায়ন কিভাবে প্রভাব ফেলে দেখে নেওয়া যাক-

এখানে একটু বলে রাখি, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে ডায়াটমের পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং যায় ফলে মাছ সহ সামুদ্রিক জীবের পরিমাণ আস্তে আস্তে হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু ‘নকটিলুকা’ অ্যালগির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে না। এবার ভাবছেন ডায়াটমের পরিমাণ কেন হ্রাস পেয়ে যাচ্ছে?

দেখুন, আমরা জানি উষ্ণতার সাপেক্ষে সমুদ্র জলেরও কয়েকটি স্তর লক্ষ করা যায়। এবার লক্ষনিয় বিষয় হল বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রতলের ওপরের স্তর এবং নীচের স্তরের মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্য খুব বেরে যাচ্ছে। ফলে সমুদ্র তলদেশের সিলিকেট জাতীয় পদার্থ সমুদ্রের ওপরের স্তরে প্রবাহিত হচ্ছে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সূর্যের আলোর সাথে সাথে সিলিকেট জাতীয় পদার্থ ডায়াটমের বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন। যদি সিলিকা না পায় তাহলে ডায়াটমের অস্তিত্ব সংকট দেখা দেয়।

যেহেতু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রতলের তাপমাত্রায় পার্থক্য দেখা দেয় এবং যায় ফলে সিলিকার অভাবে ডায়াটমের হ্রাস ঘটছে। আর ডায়াটম হ্রাস পেলে মাছের পরিমাণ ও হ্রাস পাচ্ছে (কারণ মাছ গুলি ডায়াটমকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে)। নিচের ছবিটির সাথে মিলিয়ে দেখুন।

উষ্ণতার সাপেক্ষে সমুদ্রের বিভিন্ন স্তর
চিত্রে উষ্ণতার সাপেক্ষে সমুদ্রের বিভিন্ন স্তর গুলিকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে

এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই যে বিশ্ব উষ্ণায়ন হচ্ছে, এটি ‘নকটিলুকা’ অ্যালগিকে কোনো ভাবেই প্রাভাবিত করছে না। যায় ফলে ‘নকটিলুকা’ অ্যালগি ক্রমাগত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং এরাই রাতের বেলা আলো হিসাবে চকচক করে। এবং আমাদের মনে হয় সমুদ্র সৈকতে আলো জ্বলছে।

এই ব্যপারে SC Shenoi(Director, INCOIS) তাঁর মতামত এরূপ ভাবে প্রকাশ করেছেন- “Remarkably, the waters in the study area were observed to have sufficient oxygen clearly opposing any linkage between low oxygen and Noctiluca growth. Intensifying global-warming conditions, thus may be expected to disrupt the fish-food chain and cause a decline of fisheries in the region।”

তথ্য সংগ্রহে- স্টুডেন্টস কেয়ার

তথ্য সূত্র- দ্য হিন্দু

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 2
    Shares
error: স্টুডেন্টস কেয়ার কতৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত !!